জিপিএ-৫ পাওয়া কি অভিশাপ!

বুধবার (২৩/৭/০৮) প্রথম আলো – খোলা কলম

মাত্র কয়েক বছর আগেও এসএসসি পরীক্ষায় সারা দেশে শ পাঁচেক জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীকে নিয়ে আমরা গর্ব করেছি। এবার পেয়েছে প্রায় ৪২ হাজার, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে পেয়েছে আরো প্রায় সাড়ে ১০ হাজার। এটা কি হঠাৎ মেধাবীদের স্কুরণ, নাকি জিপিএ মূল্যায়ন পদ্ধতির গুণ, তা বলা মুশকিল। তবে জিপিএ-৫-এর এই আতিশয্যে প্রকৃত মেধাবীদের অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিরিক্ত বিষয়সহ ১১টি বিষয়ে এ-প্লাস পেয়েও অনেক শিক্ষার্থী এ বছর তাদের পছন্দের ভালো কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। কারণ তাদের বয়স কম। ১০ বছর আগে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির সময় প্রমাণ করতে হয়েছে যে তাদের বয়স বেশি নয়। ঢাকায় ভালো স্কুলে শিশুদের ভর্তির সময় ডান হাত দিয়ে বাঁ কান ছোঁয়ার পরীক্ষা নেওয়া হয়। সফল হলে প্রমাণিত হয় বয়স বেশি, আর তাই তাকে ভর্তি করা হয় না। যাদের বয়স কম, তারা ভর্তির সুযোগ পায়। আর সেটাই এখন তাদের কাল হলো! ফল খুব ভালো কিন্তু বয়স কম, তাই ভর্তির সুযোগ নেই। সেখানে বেশি বয়সের অনেক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। প্রকৃত মেধাবী অনেককে যেতে হয়েছে দ্বিতীয় সারির কলেজে। বয়সের ভিত্তিতে ভর্তির এই উদ্ভট নিয়মটি যে বিভ্রান্তিকর ও পরিত্যাজ্য, তাতে সন্দেহ নেই।

আগে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বিভাগ ছিল; স্টার মার্কস ছিল, সেরাদের সেরা প্রথম ২০ জনের ছবি ছাপা হতো কাগজে। একটা প্রতিযোগিতা ছিল। ভালো শিক্ষার্থীরা তারকা লাভ করা এবং প্রথম-দ্বিতীয় হওয়ার জন্য পড়াশোনায় বেশি মন দিত। কিন্তু এর কিছু সমস্যাও ছিল। প্রথম, দ্বিতীয় হওয়ার জন্য একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছিল। কিছু অসাধু কোচিং সেন্টার দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, যারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করার বাণিজ্যে শিক্ষাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। আবার আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সংগতি রেখে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের প্রয়োজনও দেখা দেয়। এ অবস্থায় জিপিএ পদ্ধতির প্রবর্তন। প্রথমে সবাই আমরা একে স্বাগত জানাই। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই যে ব্যবস্থাটি ভেতর থেকে সারশূন্য হয়ে পড়বে, তা ভাবা যায়নি। প্রকৃত মেধাবীদের অনেকে মনে করে এ পদ্ধতিটি তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ভালো ফল করেও তারা ভালো কলেজে ভর্তি হতে পারছে না। তারা হতাশায় ভেঙে পড়ছে। মেধাবীদের হতাশ হওয়ার সংগত কারণ আছে কি না, সে বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ মনে করেন, সবাইকে ঢাকার সেরা কলেজেই পড়তে হবে কেন। আর কলেজের ভালো-মন্দ তো আপেক্ষিক একটি বিষয়। গত বছরও তো অনেক শিক্ষার্থী প্রচলিত অর্থে নামীদামি কলেজে ভর্তি হতে পারেনি, তাতে যে তাদের শিক্ষাজীবন ভেঙে পড়েছে সে রকম ভাবার কোনো কারণ নেই। তাঁর এ যুক্তি মেনে নিয়েও বলা যায়, সমস্যার আরেক পিঠও আছে।

এদিকে আলোকপাত করেছেন বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ। তিনি যথার্থই মনে করেন যে বর্তমান পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি সেরা মেধাবীদের টানতে অক্ষম, কারণ তারা জানে যে ৮০ পাওয়া যা, ৯৯ পাওয়াও তা-ই। সবাই ‘এ’ প্লাস! তাহলে অতি মেধাবীরা কেন ১০০-তে ১০০ পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত খাটবে। সুতরাং এ ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি মেধা বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে উঠছে। অধ্যাপক কায়কোবাদ বর্তমান মূল্যায়ন পদ্ধতির যে সংস্কার চেয়েছেন, তাঁর যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যাবে না। এটা তো অবশ্যই আমাদের ভাবতে হবে যে মুড়িমুড়কি সমান দর হয়ে গেলে প্রকৃত মেধাবীরা গুটিয়ে যাবে।

সে জন্য ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী মনে করেন, অন্তত সর্বোচ্চ ৮০ থেকে ১০০ পর্যন্ত নম্বরকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন, ৯০-১০০ ধাপে ‘এ’ প্লাস এবং ৮০ থেকে ৯০ শুধু ‘এ’। এর নিচে ধাপে ধাপে ‘এ’ মাইনাস ইত্যাদি। এর সুবিধা হলো, মেধাবীরা আরও ভালো করার বাড়তি প্রেরণা পাবে। তাঁর এ চিন্তার ভিত্তিতে বর্তমান গ্রেড-সীমার পুনর্বিন্যাস করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ৮০ থেকে ১০০ নম্বরের অংশটিকে দুইয়ের পরিবর্তে চারটি গ্রেডে ভাগ করলে সেরা শিক্ষার্থীদের মেধার মূল্যায়ন আরও নিবিড়ভাবে করা সম্ভব। কিন্তু তার পরও সমস্যা থেকে যাবে।

আমাদের দেশের গ্রেডিং পদ্ধতি নিয়ে অনেক শিক্ষাবিশেষজ্ঞ চিন্তাভাবনা করছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে শহরে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের কাজে নিয়োজিত প্রবাসী বাংলাদেশি প্রকৌশলী সুকোমল মোদক সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র রচনা করেছেন। তিনি বুয়েটে পড়াশোনা করেছেন। বাংলাদেশের এসএসসি ও এইচএসসিতে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে তিনি যে মত ব্যক্ত করেছেন, তার মূল কথা হলো বর্তমান লেটার গ্রেডিং পদ্ধতির সংস্কার করে তা বিশ্বমানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতি এমন হতে হবে, যেন মেধাবীরা ক্রম অনুযায়ী তাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানতে পারে। এ জন্য বর্তমান পদ্ধতির পরিবর্তে অধিকতর বিজ্ঞানসম্মত ‘পারসেন্টাইল র‌্যাংকিং’ পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করার কথা তিনি বলেছেন। এর সুবিধা হলো, একজন শিক্ষার্থী মেধার বিচারে কতজনের ওপরে আছে, তার সেই তুলনামূলক অবস্থান নির্ণয় করা যাবে। এতে বিভিন্ন বছর প্রশ্নপত্র কঠিন বা সহজ হওয়ার কারণে নম্বর প্রাপ্তিতে যে হেরফের হয়, তা আপনাআপনি দূর হবে। আবার দেশের বিভিন্ন বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ও বিভিন্ন পরীক্ষকের মূল্যায়নের মধ্যে যেসব পার্থক্য থাকে, বিচ্যুতি থাকে, সেগুলো গ্রহণযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনার ব্যবস্থাও এতে থাকবে। এ দিকটি আমরা অনেক সময় খেয়াল করি না। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতির জন্য দেশের মধ্যে মূল্যায়নমানকে একই মাত্রায় তুলনীয় হতে হবে। না হলে ঢাকা বোর্ড, যশোর বোর্ড আর মাদ্রাসা বোর্ড প্রভৃতির অধীনে পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়ন একই মানদণ্ডে বিচার্য হবে কীভাবে। সুকোমল মোদক তাঁর গবেষণাপত্রটি ১৩-১৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘একুশ শতকে বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপন করেন। এ বিষয়ে আরও বিষদভাবে জানতে আগ্রহীরা ই-মেইলে (sukomal_modak@yahoo.com) যোগাযোগ করতে পারেন।

আমরা চাই পরীক্ষার মূল্যায়নে বর্তমান গ্রেডিং পদ্ধতির প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হোক, যেন শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ মেধা অনুযায়ী মোটামুটি সঠিক মানের মূল্যায়ন লাভ করতে পারে। যদি একটি গ্রহণযোগ্য মানের মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকে, তাহলে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের পরীক্ষার সনদ সমাদৃত হবে। সে জন্য অবশ্য পরীক্ষা ও মূল্যায়নব্যবস্থাটি ত্রুটিমুক্ত করতে হবে। এসএসসি ও এইচএসসি আমাদের দেশের পরীক্ষার মূল দুটি স্তর। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য যেন আবার নতুন করে ভর্তি পরীক্ষা দিতে না হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্যই এ দুটি পরীক্ষা ও মূল্যায়ন আরও বেশি মানসম্পন্ন হতে হবে। এটা ঠিক যে যুক্তরাষ্ট্রেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য স্যাট, জিআরই প্রভৃতি পরীক্ষা দিতে হয়। কিন্তু সেখানে হাইস্কুল পর্যায়ে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বলতে গেলে তেমন কোনো পরীক্ষাই দিতে হয় না। বছর শেষ হলেই পাস, পরীক্ষা সেখানে নামমাত্র। ১২ বছরের স্কুলশিক্ষার পর জিইডি (জেনারেল এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট) পরীক্ষা শেষে তাদের হাই স্কুল ডিপ্লোমা দেওয়া হয়। সুতরাং এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আলাদা পরীক্ষা না নিয়ে উপায় নেই। আমাদের দেশেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা দিতে হয়। কারণ এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ও মূল্যায়ন যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য নয়। এখানে যদি আমরা নির্ভরযোগ্য ও মানসম্পন্ন পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারি, যদি সেখানে মেধার বিচার নিয়ে প্রশ্ন না থাকে, তাহলে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আলাদা পরীক্ষার প্রয়োজন থাকবে না।

তবে এখানে আরেকটি দিক বিবেচনায় রাখা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য যদি আলাদা পরীক্ষার ব্যবস্থা না রাখা হয়, তাহলে যে লাখ লাখ শিক্ষার্থী এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা দেয় তাদের বেশির ভাগই পরীক্ষা ও খাতা দেখার কড়াকড়িতে সম্মানজনক ফলাফল লাভে ব্যর্থ হবে। এটা কি ঠিক হবে? অন্যদিকে, কেউ হয়তো গণিত, পদার্থবিদ্যা প্রভৃতিতে ভালো, কিন্তু জীববিজ্ঞানে খারাপ। এ জন্য সে এইচএসসিতে খুব ভালো ফল না করলেও বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় অনায়াসে ভালো করতে পারে। ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকলে এ ধরনের মেধাবী শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হবে। তাই পাবলিক পরীক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা আলাদা রাখাই ভালো। ভারতে এ ব্যবস্থা আছে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাগুলো মানসম্পন্ন ও নির্ভরযোগ্য করার পাশাপাশি এসব পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা যেন মোটামুটি সম্মানজনক ফল লাভ করতে পারে তা নিশ্চিত করা দরকার। সেখানে যদি জিপিএ-৫-এর ছড়াছড়ি থাকে, থাকুক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য তার মেধা বিচারের জন্য ভিন্ন ধরনের পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একসঙ্গে ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেমন হয় মেডিকেল কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও এ রকম ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি নিজেদের বনেদি দাবি করে শুধু তাদের ক্ষেত্রে পৃথক ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি বিবেচনার কথা বলতে পারে। এই খুঁটিনাটি বিষয়গুলো অবশ্যই ঠিক করে নিতে হবে। মূল কথা হলো, উচ্চশিক্ষার জন্য মেধাবিচারের স্বতন্ত্র একটি ব্যবস্থা রাখার কথা সক্রিয় বিবেচনায় রাখা উচিত।

আমাদের দেশে শুধু পরীক্ষা ও মূল্যায়নেই নয়, শ্রেণীকক্ষে পাঠদানেও দৈন্য লক্ষ করার মতো। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা নষ্ট হয়ে যায়। একজন শিক্ষক যেভাবে একটি গণিতের সমস্যার সমাধান শ্রেণীকক্ষে দেখিয়ে দেন, তার বাইরে অন্য কোনো সমাধান কেউ লিখলে সেটা শুদ্ধ হলেও শিক্ষক সানন্দে তাকে গোল্লা দিয়ে বসেন। কারণ তিনি ভাবেন, তাঁর নির্দেশিত সমাধান ছাড়া আর সবই ভুল। এ অবস্থায় একমাত্র মুখস্থ বিদ্যায় পারদর্শীরাই তথাকথিত মেধাবী বলে পরিগণিত হয়। অথচ মুখস্থ বিদ্যা সৃজনশীলতার সবচেয়ে বড় শত্রু।

ব্রিটেনে প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হয়, কোন শিক্ষার্থীর কোন দিকে বিকাশ লাভের সুযোগ বেশি। কেউ হয়তো স্কুল পাসের পর শিল্পকলা, কেউ কারিগরি বিদ্যা, আবার কেউ হয়তো গবেষণা বা অধ্যাপনার লাইনে গেলে ভালো করবে। সে অনুযায়ী তাদের পরবর্তী শিক্ষাজীবন পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি করা সেখানে শিক্ষা বিভাগের একটি বড় কাজ। কার সাফল্য কোন দিকে, সেটা নির্ধারণে শিক্ষার্থীদের সাহায্য করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আমাদের মতো কলেজ পাস করে সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে না। যার যার ঝোঁক ও যোগ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন পেশা বা বিভিন্ন ধারার শিক্ষা লাভের সুযোগ তাদের থাকে। আবার যুক্তরাষ্ট্রে স্কুল থেকেই বিভিন্ন মেধার বিকাশের সুযোগ রয়েছে। যেমন, কেউ যদি ষষ্ঠ শ্রেণীতেই গণিতে বিশেষ পারদর্শিতা দেখায়, তাহলে তাকে আলাদাভাবে উচ্চতর গণিত শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া হয়। আমাদের দেশে এসব সুযোগ নেই। কিন্তু সেদিকে যেতে হবে। না হলে মেধার বহুমাত্রিক বিকাশ হবে না।

আপাতত আমরা গ্রেডিং ব্যবস্থা সংস্কারে মনোযোগী হই। এবং সেখানে সতর্ক থাকতে হবে যেন দুদিন পরপর পরিবর্তন না করতে হয়। কারণ একেক বছর একেক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করলে তা শিক্ষার্থীদের হতাশ করে ফেলে। আমরা সেটা চাই না।
আব্দুল কাইয়ুমঃ সাংবাদিক।

ব্যক্তিগত মতামত

ওদের নম্বর বেশি হলেও বয়স কম তাই ভর্তির সুযোগ নেই

রবিবার (২০/৭/০৮) প্রথম আলো – প্রথম পাতা

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সেরা ছাত্রী (ফার্স্ট গার্ল) শতাব্দী সাহা পিংকী এবার এসএসসি পরীক্ষায় প্রতি বিষয়ে গড়ে ৯৬ নম্বরেরও বেশি পেয়েছে। উদয়ন বিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রী ঋত্বিকা মজুমদারের গড় নম্বর প্রায় ৯৫ শতাংশ। রাজধানীর আলী আহমেদ উচ্চবিদ্যালয়ের আফসানা আলম খান শিক্ষাজীবনে কখনো দ্বিতীয় হয়নি, সব বিষয়ে এ প্লাস পেয়েছে। এই তিন মেধাবীর একজনও ভিকারুননিসা নূন কলেজে ভর্তির সুযোগ পায়নি।

এসব দৃষ্টান্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক নাড়া দিয়েছে। এরই সূত্র ধরে বিশেষ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে যেসব ছাত্রছাত্রীর জ্ন, তাদের বেশির ভাগই গড়ে ৮০ থেকে ৮৩ নম্বর পেয়ে কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু ১৯৯৩ সালে যাদের জ্ন, তাদের বেশির ভাগ ৯০ থেকে ৯৭ শতাংশ নম্বর পেয়েও ভর্তির সুযোগ পায়নি। শতাব্দী, ঋত্বিকা ও আফসানার জ্ন ১৯৯৩ সালে। তাই সব বিষয়ে এ প্লাস পেলেও ওরা ভর্তির সুযোগ পায়নি।

গ্রেডিং পদ্ধতি অনুযায়ী গড়ে সব বিষয়ে ৮০ নম্বর পেলে একজন পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়। কিন্তু কলেজে ভর্তির প্রতিযোগিতায় যে শিক্ষার্থী ৯৫ নম্বর পেয়েছে, তার মূল্যায়নও হচ্ছে ৮০ নম্বরপ্রাপ্ত পরীক্ষার্থীর সঙ্গে। একই গ্রেড পয়েন্ট থাকায় নম্বরের বদলে মূল্যায়ন করা হচ্ছে বয়স। গ্রেডিং পদ্ধতিতে নম্বর দেখার সুযোগও নেই। যদিও শিক্ষা বোর্ড বৃত্তি দেয় নম্বরের ভিত্তিতেই।

ভিকারুননিসা নূন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রোকেয়া আকতার বেগম প্রথম আলোকে বলেন, কলেজের ভর্তি কমিটি শতাব্দী, ঋত্বিকাসহ কয়েকজনের ভর্তির বিষয় নিয়ে বিব্রত। তিনি নিজেও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছেন। অধ্যক্ষ জানান, সব বিষয়ে এ প্লাস পাওয়া ছাত্রীদের মধ্যেও ১৯৯২ সালের জুন মাস পর্যন্ত যাদের জ্ন, তাদের নেওয়া সম্ভব হয়েছে। কিন্তু যাদের নেওয়া হয়েছে তাদের অনেকের চেয়েও যে বাদ পড়া শিক্ষার্থীরা মেধাবী, এটা ভর্তি কমিটি নিশ্চিত হয়েছে। অধ্যক্ষ আরও জানান, শিক্ষা কতৃêপক্ষ বিশেষ অনুমতি দিলে তিনি ওদের নিতে চান।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমিও চাই ওই মেধাবীদের নেওয়া হোক। কারণ যখন বোর্ড বৃত্তি দেওয়া হবে, তখন নম্বর বেশি পাওয়ায় ওরাই মনোনীত হবে। এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে কলেজ কতৃêপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি।’

কয়েক বছর ধরে জিপিএর ভিত্তিতে কলেজে ভর্তি চলছে। ইতিপূর্বে ছোটখাটো সমস্যা তৈরি হলেও এ বছর তা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর প্রধান কারণ জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া। ঢাকা বোর্ডে এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৮ হাজার ৯৩৬ জন। ঢাকা শহরেই এ সংখ্যা ১০ হাজার ৮৫৭। আর সারা দেশে জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা সাড়ে ৫২ হাজার। এর মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা ১০ হাজার ৫২৬। দাখিল পাস করা ১১ ছাত্রী এবার ভিকারুননিসা নূন কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাদ্রাসা থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী আলিম পড়ার বদলে ভালো কলেজে ভর্তির চেষ্টা করছে। সাধারণত মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা একটু বেশি বয়সে পড়াশোনা শুরু করে। ফলে তাদের অনেকেই ভালো কলেজে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, কোচিং, হয়রানি, আর্থিক ক্ষতি এবং ভর্তি-দুর্নীতি রোধে তিন বছর ধরে জিপিএর ভিত্তিতে সুষ্ঠুভাবে কলেজে ভর্তি সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এ বছর জিপিএ-৫-এর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার বেড়ে যাওয়ায় ভালো কলেজগুলোর ওপর অস্বাভাবিক চাপ পড়েছে। তবে মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ভালো কলেজে প্রতিযোগিতা থাকলেও আসনের সংকট নেই।

মন্ত্রণালয়ের একজন নীতিনির্ধারণী কর্মকর্তা বলেছেন, নতুন পরিস্থিতি এবং বিশেষ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়ায় আগামী বছর বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।

এদিকে সব বিষয়ে এ প্লাস পেলেও ভর্তির নিশ্চয়তা না থাকায় অনেকেই পাঁচ-সাতটি কলেজ থেকে ফরম সংগ্রহ করছে। রাজধানীর সিটি কলেজের সামনে কথা হয় অভিভাবক সালমা জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁর মেয়ের জন্য ছয়টি কলেজ থেকে ফরম নিয়েছেন। এরই মধ্যে তিনটি নাকচ হয়ে গেছে। বাকি তিনটি কলেজে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

অন্যদিকে একাধিক ভালো কলেজে ভর্তির জন্য মনোনীত হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম নয়। অনেকেই একাধিক কলেজে ভর্তির তালিকায় থাকবে। তাই মূল ভর্তি শেষ হলে দেখা যাবে, কিছু আসন খালি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে মূল তালিকার পাশাপাশি অপেক্ষমাণ তালিকা থেকেই শিক্ষার্থী নেওয়া হবে।

ঢাকা বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২৭ জুলাই থেকে বোর্ড নম্বরপত্র দেওয়া শুরু করবে। নম্বরপত্র হাতে পেলে একজন শিক্ষার্থী একাধিক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারবে না। কারণ তখন নম্বরপত্র কলেজে জমা রাখতে হবে।

ব্যক্তিগত মতামত

এ সবই হচ্ছে নির্বুদ্ধিতার ফল। বর্তমান গ্রের্ডিং সিস্টেম দেশের প্রতিটি extraordinary ছাত্র-ছাত্রীর মেধা বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। আগে যেখানে বছরে নূন্যতম ১০ জন হলেও অতি-উচ্চমানের মেধাবী তৈরী হতো, সেখানে সবাই এখন একট গতবাঁধা ছকে পড়ে যাচ্ছে। একজন ছাত্র যদি ৮০ পাবার উদ্দেশ্য নিয়ে পড়াশোনা করে, তাও আবার জীবনের উষালগ্নে, ভবিষ্যতে প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে বাধার সন্মুখীন হতে হবে। হয়তোবা ভবিষ্যতে কোন নামকরা বিজ্ঞানীর নাম শুনে আর পরিচিত মনে হবেনা। কোন মেধাবী আর বাংলাদেশের পতাকাকে তুলে ধরবে না। একজন মেধাবী যদি তার মেধার উপযুক্ত প্রতিদান না পায়, সেটা অবশ্যই তার মেধার অগ্রগতিতে বাধার সৃষ্টি করবে।

এখন যেটা হবে, প্রতিটি গার্জিয়ান তার ছেলেমেয়ের বয়স বাড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লাগবেন। পরবর্তীতে বিশ্বের সবখানে তার সময়বয়সীদের থেকে সে কয়েকবছর পিছিয়ে থাকবে। এমনকি দেশেও সরকারী চাকরীতে বাধাগ্রস্থ হবে।আমার মতে স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে বয়স কম কে আরো বেশী প্রাধান্য দেয়া উচিৎ। ১৫ বছরের একজন যদি ১৬ বছরের একজনের সমান নম্বর পায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা ছোটজনকেই অধিক মেধাবী বলবো। বর্তমান গ্রেডিং ব্যবস্থা কার্যকর রেখেও এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায় যদি গ্রেডিং এর সাথে সাথে marks equivalence দেবার ব্যবস্থা করা যায়।

জিপিএ ব্যবস্থার আবর্তে শিক্ষাব্যবস্থা

রবিবার (১৩/৭/০৮) প্রথম আলো – খোলা কলম

এসএসসি পরীক্ষার আরেকটি ফলাফল প্রকাশিত হলো। এই ফলাফল যদি আমাদের শিক্ষার মানের নির্দেশক হয়ে থাকে তো শিক্ষাসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের সাফল্যে ডুগডুগি বাজাতে পারেন। ২০০৪ সালে জিপিএ-৫-এর সংখ্যা যেখানে নয় হাজার ৮৮৬ ছিল, তা বৃদ্ধি পেয়ে পরবর্তী বছরগুলোয় ১৭ হাজার ২৯৪, ৩০ হাজার ৪৯০, ৩২ হাজার ৬৪৬ এবং এ বছর তা ৫২ হাজার ৫০০। পত্রিকান্তরে প্রকাশ একশ্রেণীর কোচিং সেন্টারের প্রতারণা থেকে মুক্তি, অভিভাবকদের আর্থিক চাপমুক্ত করতে এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তি-ইচ্ছুদের দুর্ভোগ ও হয়রানি লাঘবকে আমলে রেখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ভর্তি নীতিমালা তৈরি করছে। যে কোচিং সেন্টারগুলোয় পড়ালেখা করে ছাত্ররা বুয়েট, মেডিকেল কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে হিরো হচ্ছে, সেই কোচিং সেন্টারগুলোই নাকি ভিলেন। কোনো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে আমরা এখনো প্রমাণ করতে পারিনি যে কোচিং সেন্টারে পড়ার সঙ্গে লোভনীয় বিষয়গুলোতে ভর্তি হওয়ার কোনো ইতিবাচক সম্পর্ক নেই। এটা প্রমাণ করতে পারলে ছাত্র কিংবা অভিভাবক কেউই কোচিং সেন্টারের আঙ্গিনায়ও প্রবেশ করত না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রকে বলতে শুনেছি তাদের ভর্তিতে কোচিং সেন্টারের অবদান সুবিশাল অথচ কলেজের অবদান অনুল্লেখ্য। অর্থাৎ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে অকার্যকর হচ্ছে, সেখানে কোচিং সেন্টারগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও স্কুলের ফলাফল নয়, স্যাটের মতো প্রতিযোগিতাপূর্ণ টেস্টের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়। আবার সে পরীক্ষার ফলাফলও কিন্তু নম্বরভিত্তিক, জিপিএভিত্তিক নয়। যার ফলে দুজন শিক্ষার্থীর মধ্যে সহজেই ব্যবধান বের করা যায়। আমাদের মতো ৫২ হাজার ৫০০ ছাত্র-ছাত্রীরই সমান হওয়ার সুযোগ নেই। এর অর্ধেক ছাত্র-ছাত্রীই সবচেয়ে ভালো কলেজগুলোয় ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে না, সর্বোচ্চ জিপিএধারী হয়েও। ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া ভর্তি করলেও কিন্তু প্রকারান্তরে কোচিং সেন্টারের অবদানকেই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। সুতরাং কোচিং সেন্টার থেকে রেহাই পেতে পাবলিক পরীক্ষাও বাদ দিতে হবে। আমাদের বর্তমান পরীক্ষাপদ্ধতি বহাল রেখে কোচিং সেন্টারকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কারণ, বেশির ভাগ স্কুল-কলেজে পড়ালেখা হয় না। শুধু তা-ই নয়, এমনকি যেসব স্কুল-কলেজে হয়, তাদের ছাত্র-শিক্ষক উভয়ই কোচিংয়ের সঙ্গে যথেষ্ট সম্পর্কযুক্ত। আশ্চর্যের বিষয়, এমনকি অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশেও এই কোচিং-সংস্কৃতি চালু হয়েছে। আমার এ লেখাটুকু পড়ে আমাকে কোচিং সেন্টারের প্রবক্তা মনে করাটা সঠিক হবে না।

১০ লাখ ছাত্রছাত্রীকে মূল্যায়নের জন্য প্রশ্নপত্র, পরীক্ষাপদ্ধতি এবং মূল্যায়ন এমন হওয়া উচিত যে তোতা পাখির মতো সেখানে বুলি আওড়িয়ে পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়া যাবে না। প্রকৃতপক্ষে স্যাট এবং জিআরই পরীক্ষার মাধ্যমে সারা পৃথিবীর মেধাবী শিক্ষার্থীদের যেখানে বাছাই করা যাচ্ছে, সেখানে শুধু আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মেধা ও দক্ষতা যাচাই করার মতো পাবলিক পরীক্ষা এবং মূল্যায়নপদ্ধতি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়ে কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে অবস্থান কোনো অবস্থাতেই কার্যকর হতে পারে না। যে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ৫২ হাজার ৫০০ ছাত্র-ছাত্রীকে জ্ঞানে, বিদ্যায়, মেধায় ও দক্ষতায় পার্থক্য করতে পারে না, তার অকার্যকারিতার জন্য আর বড় কোনো উদাহরণের প্রয়োজন নেই। যাঁরা ভেবেছিলেন গ্রেডিং পদ্ধতি প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত বিশ্বের সঙ্গে এক কাতারে উঠে গেছে, তাঁদের নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। আর এ পদ্ধতির মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ভর্তি করতে হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে শুধু জ্ন তারিখ নয়, নামের আদ্যাক্ষর দিয়েও টাই ব্রেক করতে হবে। উল্লেখ করা যেতে পারে, শিক্ষার মানে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের অনেক সুনাম থাকলেও তারা গ্রেডিং পদ্ধতিতে যায়নি। এখনো তারা শ্রেষ্ঠ ছাত্রদের স্কুলের তালিকা পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশ করে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ভর্তি পরীক্ষা সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যত দিন পাবলিক পরীক্ষার জন্য একটি কার্যকর পরীক্ষা ও মূল্যায়নপদ্ধতি আমরা প্রবর্তন করতে না পারি, তত দিন হাস্যকর নতুন নতুন টাই ব্রেকিং পদ্ধতি আবিষ্কার না করে ভর্তি পরীক্ষা চালু রাখাটাও শ্রেয়; যদিও তাতে বেসরকারি অনানুষ্ঠানিক কোচিং সেন্টারগুলোর কার্যকারিতা এবং আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার অকার্যকারিতা বারবার প্রতিষ্ঠিত হবে।

এ ছাড়া একজন পরীক্ষার্থী যদি জানে এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল তার পরবর্তী পর্যায়ের ভর্তিকে সুনিশ্চিত করবে, তাহলে পরীক্ষা-পরবর্তী চ্যালেঞ্জবিহীন দীর্ঘ সময় তাকে উচ্ছন্নে প্রেরণ করতে যথেষ্ট হবে। উন্নত বিশ্বে ছাত্রদের মেধাকে চ্যালেঞ্জ করে কত রকম প্রতিযোগিতা রয়েছে। আর আমাদের দেশে যৎকিঞ্চিত ছিল, তাকে বন্ধ করে গোটা তরুণ প্রজ্নকে অতীব সাধারণ্যে পরিণত করা হচ্ছে। এখন আবার শোনা যাচ্ছে, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে কীভাবে বিভিন্ন বিষয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা যায়, তার নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। জিপিএ-৫-এর সংখ্যা পাঁচ বছরে পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষাব্যবস্থা পাঁচ গুণ উন্নত হয়েছে; এটা যতটা বিশ্বাসযোগ্য, তার থেকে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পাঁচ গুণ অবনতি হয়েছে। স্কুল-কলেজের পরীক্ষা এবং পরবর্তী পর্যায়ে ভর্তি হওয়ার মধ্যে যে দীর্ঘ সময় তাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার কোনো বিকল্প খুঁজে না পেলে অবশ্যই ভর্তি পরীক্ষার মতো চ্যালেঞ্জিং একটি ঘটনা সামনে রাখতে হবেই। একটি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা বিভাগে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই যুক্তিনির্ভর হবে না। এ অবস্থায় বর্তমানের ঘটনাবিবর্জিত শিক্ষাব্যবস্থাকে কীভাবে ঘটনাসমৃদ্ধ করে আমাদের তরুণ সম্প্রদায়কে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির জ্ঞানে ও দক্ষতায় একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে-সেটাই আমাদের চ্যালেঞ্জ। একমাত্র উদ্বৃত্ত মানুষের দেশে উন্নতমানের শিক্ষার মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। বৃহত্তর এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত না করে গৃহীত কোনো সিদ্ধান্তই যে জনকল্যাণমুখী হতে পারে না, তা আমাদের বিশ্বাস করতে হবে। এ অবস্থায় একবিংশ শতাব্দীর প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে আমাদের টিকে থাকতে হলে ক্ষয়িষ্ণু শিক্ষাব্যবস্থার পরিপূরক কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তার একটি প্রস্তাব করা হলো।

১· শিক্ষাকে ঘটনাসমৃদ্ধ করার জন্য বর্তমান গ্রেডিং পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি ধাপসম্পন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ফিরে যেতে হবে।
২· পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়নে পরীক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার মূল্যায়নকে লক্ষ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্যাট-জাতীয় পরীক্ষাপদ্ধতিকে কীভাবে আমাদের দেশের উপযোগী করা যায়, তা নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে।
৩· তরুণ ছাত্রছাত্রীদের সামনে অধিকতর সংখ্যায় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সূচনা করতে হবে। সারা দেশে যথাযোগ্য ও যোগ্যসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে স্কুল-কলেজ সমৃদ্ধ করাটা সহজসাধ্য নয়, তবে অফুরন্ত প্রাণশক্তির অধিকারী তরুণ-তরুণীর সামনে সুস্থ ও জনপ্রিয় প্রতিযোগিতার আয়োজন করলে আমাদের তরুণেরা যে দক্ষতা অর্জনের পথ নিজেরাই খুঁজে পায়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো আমাদের কম্পিউটারের শিক্ষার্থীদের প্রোগ্রামিংয়ের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের তুলনায় শ্রেয়তর সফলতা অর্জন।
৪· তুলনামূলকভাবে অবহেলিত অঞ্চলের দুর্বল অবকাঠামোসম্পন্ন এবং অনুল্লেখ্যমানের শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত স্কুল-কলেজগুলোয় কম্পিউটার এইডেড লার্নিং প্যাকেজ সরবরাহে অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের যোগ্যমানের শিক্ষায় উৎসাহিত করা।
৫· স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির জন্য স্যাট-জাতীয় প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষা আমাদের দেশের উপযোগী করে তার ফলাফলকে ব্যবহার করা।
৬· পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে উৎকর্ষ অর্জনের জন্য একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা গড়ে তোলা। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে স্কুল-কলেজগুলোর উপজেলা, জেলা, বিভাগ কিংবা দেশভিত্তিক র‌্যাংক ঘটা করে গণমাধ্যমের সাহায্যে প্রকাশ করা এবং এসব পরীক্ষায় স্কুল-কলেজের অর্জনকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য পুরস্কৃত করা। মনে রাখতে হবে, উৎকর্ষ অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতা এবং যোগ্য পুরস্কার থেকে ব্যয়-সাশ্রয়ী আর কোনো পদ্ধতি নেই।
৭· মহাপরাধীন আমাদের ভূখণ্ডে জগদীশ বসু, সত্যেন বোস কিংবা মেঘনাদ সাহার মতো বিশ্বমানের বিজ্ঞানীর জ্ন হয়েছিল। অথচ স্বাধীনতা অর্জনের পর এমন মাপের বিজ্ঞানী বের হয়ে যে আসছে না তার কারণ হলো আমাদের উচ্চতর শিক্ষার মানও নি্নগামী। উচ্চশিক্ষাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতেও চাই প্রতিযোগিতাপূর্ণ একটি পরিবেশ সৃষ্টি, যা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের পাঁচ শতাংশ মানুষের দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির এমন জয়জয়কার। সুতরাং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিংবা অন্যান্য উন্নত দেশের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও অর্জনের ভিত্তিতে র‌্যাংক দিতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর নিয়মিত তা আপডেট করতে হবে।
৮· অধিকতর যোগ্য স্মাতকদের শিক্ষকতার পেশায় উৎসাহিত করার জন্য শিক্ষকদের উচ্চতর বেতন স্কেল দিতে হবে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষকদের শুধু সামাজিক মর্যাদাই হ্রাস পায়নি, আর্থিক সংগতিও হ্রাস পেয়েছে। ফলে যোগ্য স্মাতকেরা অধিকতর আকর্ষণীয় চাকরিতে যোগ্য দিচ্ছে, এমনকি শ্রেণীর শ্রেষ্ঠতম ছাত্ররাও কোচিংমুখী হচ্ছে।
৯· কোচিং সেন্টারগুলোর যেকোনো অনৈতিক কাজকে নিরুৎসাহিত করতে কঠোর হওয়া যেতে পারে, তবে দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাটিয়ে উঠতে যদি কোচিং সেন্টারগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা অপ্রয়োজনীয়।
১০· এমন ঘনবসতিপূর্ণ ক্ষদ্র আয়তনের দেশটিকে প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে টিকে থাকতে হলে মানবসম্পদ উন্নয়নের বিকল্প নেই। আর মানবসম্পদ উন্নয়নের চাবিকাঠি হলো শিক্ষা- উন্নতমানের শিক্ষা। আমাদের নীতিনির্ধারকেরা শিক্ষার মানকে উন্নত করতে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেবেন-এটা আমাদের প্রত্যাশা।
মোহাম্মদ কায়কোবাদঃ অধ্যাপক, সিএসই বিভাগ, বুয়েট, ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী।

ব্যক্তিগত মতামত